Thursday, November 16, 2017

তোমাদের উপর সাতটি সুদৃঢ় আকাশ স্থাপন করেছি এবং একটি অতি উজ্জল ও উত্তপ্ত প্রদীপ বানিয়েছি।



সূরা আন-নাবা

আলচ্য আয়াত ঃ ১২-২৩
সূরাটি মক্কায় অবতীর্ণ



"পরম দয়াময় নিরতিশয় মেহেরবান আল্লাহর নামে"

১২. " তোমাদের উপর সাতটি সুদৃঢ় আকাশ স্থাপন করেছি ১৩. এবং একটি অতি উজ্জল ও উত্তপ্ত প্রদীপ বানিয়েছি। ১৪. আর মেঘমালা হতে অবিশ্রান্ত বৃষ্টি বর্ষন করেছি ১৫-১৬. এই উদ্দেশ্যে যে, যাতে তার সাহায্যে ফল-ফসল, শাক-সবজি ও ঘন সন্নিবদ্ধ বাগ-বাগিচা উৎপাদন করতে পারি। ১৭. নিঃসন্দেহে চুড়ান্ত বিচারের দিনটি পূর্ব থেকে নির্ধারিত। ১৮. সেদিন সিংগায় ফুঁ দেওয়া হবে আর তোমরা দলে দলে বের হয়ে আসবে। ১৯. তখন আকাশ মন্ডলকে উন্মুক্ত করে দেওয়া হবে, ফলে তা কেবল দরজার পর দরজা হয়ে দাঁড়াবে। ২০. তখন পর্বতগুলিকে চলমান করে দেওয়া হবে। ফলে তা শুধু নিছক মরিচিকায় পরিণত হবে। ২১. নিশ্চয়ই জাহান্নাম একটি ফাদ বিশেষ। ২২. আল্লাহদ্রোহীদের জন্য আশ্রয়স্থল। ২৩. তাতে তারা যুগ যুগ ধরে অবস্থান করবে।"

ব্যাখ্যা ঃ

সুদৃড় শব্দটি ব্যবহৃত হয়েছে এই অর্থে যে, আকাশ মন্ডুলের সীমানা সমূহ অত্যান্ত সুসংবদ্ধ। এতখানি সুসংবদ্ধ যে, তাতে একবিন্দু পরিবর্তন বা পরিবর্ধন ও হতে পারে না এবং সে সীমানা সমূহ অতিক্রম করে ঊর্ধলোকের অগণিত গ্রহ-নক্ষত্রের মধ্যে হতে একটি অপরটির সাথে যেমন সংঘর্ষ বাধায় না, তেমনি তার কোনোটি বিচ্ছিন্ন হয়ে পৃথিবীর ওপর এসে পতিত হয় না।

উজ্জল ও উত্তপ্ত প্রদীপ অর্থ সূর্য। আয়াতে উল্লিখিত অতিব উত্তপ্ত ও অতিশয় উজ্জল। অনুবাদে এ দুটি দিককেই শামিল করা হয়েছে। এই সং ক্ষিপ্ত বাক্যাংশে আল্লাহ তা'আলার অসীম কুদরত ও অসামান্য সৃষ্টিকুশলতার এক বিশাল ও বিপুল নিদর্শনের দিকে ইংগিত করা হয়েছে। সে নিদর্শন সূর্যের ব্যাস পৃথিবীর ব্যাস থেকে ১০৯ গুন এবং তার আয়তন পৃথিবীর আয়তনের চেয়ে ৩ লক্ষ ৩৩ হাজার গুন বড়। তার তাপমাত্রা ১ কোটি ৪০ লক্ষ ডিগ্রী সেন্টিগ্রেড। পৃথিবী থেকে ৯ কোটি ৩০ লক্ষ মা ইল দূরে অবস্থিত হওয়া সত্তেও তার রশ্মি এতই তেজস্বী যে, তার দিকে মানুষ খোলা চোখে তাকিয়ে থাকলে তার দৃষ্টিশক্তি হারিয়ে ফেলা অবধারিত। তার তাপ এতই প্রচন্ড যে, পৃথিবীর কোন কোন অংশে তার প্রবাভে তাপমাত্রা ১৪০ ডিগ্রী ফারেনহাইট পর্যন্ত পৌছায়। কিন্তু মহান আল্লাহর সৃষ্টিকুশলতার কল্যাণ এই যে, তিনি পৃথিবীকে সূর্য থেকে একটা নিরাপদ দূরত্বে সংস্থাপন করেছেন।বর্তমানের তুলনায় সূর্যের বেশি কাছে নয় বলে পৃথিবী বেশি উত্তপ্ত নয় এবং বেশি দূরে না হওয়ার কারনে এটি বেশি ঠান্ডা ও নয়। এর কারনে মানুষ, জীবজন্তু ও উদ্ভিদের জীবন ধারন সম্ভবপর হয়েছে। সূর্য থেকে শক্তির অপরিমেয় ভান্ডার উতসারিত হয়ে প্রতিনিয়ত পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়ছে এবং তাই আমাদের জীবন ধারণ কে সম্ভবপর করে তুলেছে। আমাদের ক্ষেতের ফসল পাকছে তার কারনে। আল্লাহর সৃষ্ট প্রতিটি জীব তার দরুনই খাদ্য লাভ করছে। তার তাপেই সমুদ্রের পানি উত্তপ্ত হয়ে তা বাশ্প আকারে উথিত হয়, তাই বাতাসের সাহায্যে পৃথিবীর বিভিন্ন অংশে ছড়িয়ে পড়ে ও বৃষ্টি বর্ষিত হয়। এ সূর্যের বুকে আল্লাহ এমন এক বিশাল অগ্নিকুণ্ড জালিয়ে রেখেছেন যা কোটি কোটি বছর থেকে আলো, উত্তাপ ও বিভিন্ন প্রকারের রশ্মি সমগ্র সৌরলোকে অব্যহতভাবে সরবরাহ করে চলেছে।

পৃথিবীতে বৃষ্টিপাতের ব্যাবস্থা এবং উদ্ভিদের তরতাজা ও শ্যামল সতেজ হয়ে ওঠার মধ্যে আল্লাহর অপরিসীম কুদরত ও সৃষ্টিকুশলতার যে বিশ্ময়কর অভিব্যক্তি কার্যকর হয়ে আছে তা আমরা একটু গভীর চিন্তা করলে সহজেই উপলব্ধ করতে পারব।

এ আয়াতের পর বহু সংখ্যক প্রাকৃতিক নিদর্শন ও সাক্ষপ্রমান উপাস্থাপন করে কেয়ামত ও আখেরাতে অবিশ্বাসী লোকদেরকে বলা হয়েছে যে তোমরা যদি নিজেদের চোখ উন্মীলিত করে একবার পৃথিবীর দিকে তাকাও এবং পর্বত মালা ও তোমাদের জন্ম, তোমাদের নিদ্রা ও জাগরণ এবং রাত দিনের আবর্তনের এ বিশাল ব্যাবস্থাকে অনুধাবন করতে চেষ্টা করো। বিশ্বলোকে প্রতিষ্ঠিত নিয়ম - শৃংকখলা ও আকাশ মন্ডলের ভাস্বর প্রদীপ্ত সূর্যকে লক্ষ্য করো। মেঘমালা হতে বর্ষিত বৃষ্টি ধারা ও তার সাহায্যে উৎপন্ন গাছ-গাছালি ও বৃক্ষলতা সম্পর্কে চিন্তা ও বিবেচনা করো, তাহলে তাতে দুইটি বিষয় তোমরা সুস্পষ্টভাবে দেখতে পাবে ঃ একটি এই যে এক বিরাট শক্তির প্রত্যক্ষ সহায়তা ছাড়া এসব কিছু অস্থিত্ব লাভ করতে পারে না এবং এরূপ শৃংখলা ও নিরবিচ্ছিন্নতার সাথে তা চলতেও পারে না। আর দ্বীতিয় এই যে আর এসবের প্রতিটি জিনিসেই এক বিরাট বিচক্ষণতা ও সৃষ্টিকুলতা কার্যকর রয়েছে এবং এসবের কোন কাজই উদ্দেশ্যহীন নয়। অতএব যে শক্তি এ সমস্ত জিনিস কে অস্থিত্ত দানে সক্ষম তা তাকে ধংস স বিলুপ্ত করে দিতে এবং ভিন্নরূপ পুনর্বার সৃষ্টি করতে সক্ষম নয়, এরূপ কথা কেবিল অর্বাচীনই বলতে পারে। পরন্তু যে মহা জ্ঞানী এ বিশ্বলোকে কোন কাজই উদ্দেশ্যহীন ভাবে করেন নাই, তিনি নিজেরই সৃষ্ট এ দুনিয়ায় মানুষকে বিবেক বুদ্ধি ভালো মন্দের পার্থক্য বোধ, আনুগত্য ও অবাধ্যতার স্বাধীনতা এবং নিজেরই অগণিত সৃষ্টির ওপর কতৃত্ব করার অধিকার ও সূযোগ দিয়েছেন নিতান্তই উদ্দেশহীন ভাবে, এমন কথা একজন নির্বোধ ব্যাক্তিই বিশ্বাস করতে পারে। মানুষ তার প্রদত্ত জিনিসগুলিকে ভালভাবে ব্যবহার করুক কি মন্দভাবে উভয় অবস্থার মধ্যে পরিনতির দিক দিয়ে কোন পার্থক্য হবে না, কেউ ভাল কাজ করতে করতে মরে মাটির সাথে মিশে সম্পূর্ণ বিলিন হয়ে যাবে এবং কেউ খারাফ কাজ করতে করতে মাটির সাথে একাকার হয়ে যাবে, ভালো কাজের লোক ভাল কাজ করে ভাল ফল পাবে না আবার খারাফ কাজের লোকের খারাফ কাজ গুলির হিসাব চাওয়া হবে না, এমন কথা কোন সুস্থ মস্তিষ্ক সম্পন্ন ব্যাক্তির পক্ষে চিন্তা করাও সম্ভব পর নয়। বস্তুত এই সব যুক্তিই হল কেয়ামত ও আখেরাতের জীবন সম্পর্কে অকাট্য দলিল। কুর আন মজিদের বহু যায়গায় কেয়ামত ও আখেরাতের পক্ষে এ ধরনের যুক্তি ও প্রমানই পেশ করা হয়েছে।



এখানে শিংগায় শেষ ফুৎকারের কথা বলা হয়েছে। এ ফুৎকার ধ্বনিত হওয়ার সাথে সাথেই সমস্ত মানুষ মৃত অব্যবস্থা থেকে হঠাৎ জীবন্ত হয়ে উঠবে। এখানে রোমরা বলতে কেবল সেই লোকদের বোঝানো হয়নি যারা আয়াত নাযিল হওয়ার সময় ছিল, বরং সৃষ্টির প্রথম দিন থেকে কেয়ামত পর্যন্ত যত মানুষ দুনিয়ার বুকে জন্মগ্রহণ করেছিল, সেই সব মানুষ কেই তোমরা বলে সম্বোধন করা হয়েছে।

মনে রাখা আবশ্যক যে, কুর আনের বহু স্থানের মত এই স্থানেও কেয়ামতের বিভিন্ন স্তর ও পর্যায় উল্লেখ এক সংগে করা হয়েছে। প্রথমত আয়াতে সেই অবস্থার কথা উল্লেখ করা হয়েছে যা শেষবার শিংগায় ফুক দিলে উদ্ভুত হবে। আর পরের দুই আয়াতে দ্বীতিয়বার ফুক দেওয়ার ফলে উদ্ভুত পরিস্থিতি উল্লেখ করা হয়েছে। আকাশ মন্ডল উন্মুক্ত করে দেওয়া হবে, কথাটির অর্থ উর্ধতন জগতে কোন বাধা প্রতিবন্ধকতার অস্থিত্ব থাকবে না। তখন চারদিক থেকে আসমানি বালা-মুসিবত এমন অব্যাহত ধারায় বর্ষিত হতে শুরু করবে যে, মনে হবে তার বর্ষনের সব দুয়ার বুঝি খুলে দেওয়া হয়েছে এবং তাকে প্রতিরোধ করার জন্য কোন দুয়ারই আর বন্ধ নাই। পর্বত গুলিকে চলমান করে দেওয়া ও সে গুলি মরিচিকার মত হয়ে যাওয়ার অর্থ এই যে, চোখের সামনেই পর্বত গুলি নিজ নিজ স্থান হতে উতপাঠিত হয়ে শূন্যলোকে ছড়িয়ে পড়বে। সূরা ত্বা হা য় এরূপ বর্ণনা দান প্রসংগে বলা হয়েছে ঃ " এ লোকেরা তোমাকে জিজ্ঞেস করে, সেদিন এ পর্বত গুলি কোথায় উধাও হয়ে যাবে? এদের বলো আমার রব এগুলিকে ধুলি কনায় পরিণত করে বাতাসে উড়িয়ে দিবেন এবং ভূ-পৃষ্টকে এমন সমতল মরুভূমি বানিয়ে দিবেন যে, তোমরা তাতে উচু নিচু স্থান ও সামান্য ভাজও দেখতে পাবে না।"

শিকার ধরার জন্য তৈরি করা বিশেষ স্থান কে ফাদ বলা হয়। শিকার সেখানে অজানা ভাবে আসে এবং তাতে আটকে পড়ে। এখানে জাহান্নাম কে ফাদ বলা হয়েছে এজন্য যে, আল্লাহদ্রোহী লোকেরা জাহান্নামের ব্যাপারে সম্পূর্ণ বেপরোয়া হয়ে দুনিয়ার বুকে নেচে-কুদে বেড়ায় একথা মনে করে যে, আল্লাহর এ বিশাল জগতই যেন তাদের জন্য এক উন্মুক্ত লিলা ক্ষেত্র এবং এখানে তাদের ধরা পড়ে যাওয়ার কোন আশংকা নেই। কিন্তু প্রকৃত ব্যাপার এই যে, জাহান্নাম তাদের জন্য প্রছন্ন এক ফাদ হয়ে রয়েছে। সেখানে তারা আকস্মিক ভাবেই আটকা পড়বে এবং সে অবস্থায়ই থেকে যাবে।


আল্লাহ আমাদের আমল করে জাহান্নাম থেকে বাচার তাওফিক দান করুন। (আমিন)



No comments:

Post a Comment

Thanks Bro